ইছামতি নদীকে বাঁচাতে বদ্ধপরিকর ছাব্বিশ বছরের তরুণ সাবর্ণ সরস্বতী : মুখোমুখি আলোচনায় স্থিতা সংস্থিতা।

0
2794

ইছামতি নদী। ছোটবেলায় ভূগোল বই থেকে প্রথম পরিচিত হয়ে ছিলাম ইছামতির সাথে। যে নদী ভারত আর বাংলাদেশের সীমান্ত রেখায় বয়ে ৩৩৪ কিলোমিটার পথ বয়ে চলেছে। পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া জেলার মাথাভাঙ্গা থেকে প্রবাহিত হয়েই আন্তর্জাতিক সীমানা অতিক্রম করে বাংলাদেশে চুয়াডাঙ্গা জেলার দামুরহুদা উপজেলায় প্রবেশ করেছে । এটি তারপর বাংলাদেশের চুয়াডাঙ্গা জেলা এবং ভারতের নদিয়া ও উত্তর ২৪ পরগনা জেলার সংযোগস্থল নাগাদ পশ্চিমবঙ্গে পুনর্প্রবেশ করেছে । তারপর ইছামতি উত্তর ২৪ পরগনা জেলার মধ্যে দিয়ে বনগাঁ, স্বরূপনগর, বাদুরিয়া এবং হাসনাবাদ হয়ে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়েছে।

এই নদী বাড়ে বাড়ে উঠে এসেছে লেখকদের গল্প উপন্যাসে, কবিদের কবিতায় উঠে এসেছে। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের “পথের পাঁচালী” রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা ইছামতি নদী নিয়েই কবিতা “ইছামতী নদী” র অবদান বর্ণনা করে। সেই নদী পলি জমে, কচুরিপানায় বর্তমানে মৃতপ্রায়। যার ফলে ভারত, বাংলাদেশের ইছামতি তীরে বসবাসকারী নদী নির্ভর মানুষের জীবনযাত্রাও বিপুল সংকটে। সংকটে পরিবেশের ভারসাম্য। কিন্তু সেই পরিবেশে ভারসাম্য রক্ষায় প্রশাসনের ভূমিকা ঠিক কতটুকু! সেটার পরিকল্পনা কখনওই ঠাণ্ডা ঘরে বসে আলোচনা করে করা সম্ভব নয়। সেই পরিকল্পনা কবে হবে সেই আশায় বসে থাকলে নদী মৃত্যু বসে বসে দেখা ছাড়া কিছুই হবে না।

মৃতপ্রায় ইছামতিকে নতুন করে বাঁচিয়ে তোলার প্রয়াসে এক তরুণ গড়ে তুলেছেন ইছামতি আন্দোলন। নদীয়ার দত্তপুলিয়ার ইছামতির তীরের বাসিন্দা ২৬ বছরের সাবর্ণ সরস্বতী প্রাণিবিদ্যা নিয়ে স্নাতকোত্তর করেছেন। ভাল কেরিয়ার, স্বস্তির জীবন ছেড়ে পরিবেশ রক্ষায় ইছামতিকে বাঁচানোর দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন। এলাকার মানুষের সাহায্য নিয়ে ইছামতির ১২ কিলোমিটার কচুরিপানা পরিষ্কার করেছেন। কৌতূহল তো জাগেই। জিজ্ঞেস করেছিলাম, এমন চিন্তার সূত্রপাত কবে থেকে কী ভাবে এলো?
সহজ ভাবে সাবর্ণ উত্তর দিলো, “২০০০ সালে বন্যা। তখন আমার ৭ বছর বয়স। হু হু করে জল ঢুকছে। বাবার সাথে সাইকেলে করে নদী দেখতে গিয়েছিলাম। ব্রীজের উপর তো উঠতেই পারলাম না। দেখলাম বিপুল বেগে নদী বইছে। ভীষণ ভয় পেয়েছিলাম। মনে হয়েছিল ভয়ংকর নদী। গেলেই হয়ত কিছু হয়ে যাবে। যেতামই না ওই দিকে।”
তারপর?
“আস্তে আস্তে বড় হই। সেই সময় প্রাইভেট টিউশন পড়তে যেতাম নদীর পাড়ে। জানলাম এটা সেই ইছামতি। বন্ধুদের সাথে নৌকাতেও উঠি। প্রাইভেট টিউটরের সাথে কথায় কথায় শুনলাম নদীতো মরে যাচ্ছে! বাড়িতে এসে সবার সাথে কথা বলি। নদীর সমস্যা গুলো জানতে পারি। আমি যেই নদীকে চিনেছিলাম সেই ভয়ঙ্কর অবস্থা না থাকলেও স্রোতটা তো থাকুক। কিছু মৎসজীবীদের সমস্যার কথাও শুনি। তাদের আয় নেই। জল নেই, মাছ নেই। পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। তখন আমি বি.এস.সি. করছি। আর মনের সাথে ক্রমে জড়িয়ে পড়ছি ইছামতির সাথে। এরপর স্নাতকোত্তর করতে যাই। আর যেহেতু আমার জুওলজি ব্যাকগ্রাউন্ড, তাই পরিবেশের ডাইভার্সিটি নিয়ে ভীষণ ভাবে ভাবনা চিন্তায় ইছামতি প্রভাব পড়ছিল। তখন একজন মৎসজীবীর সাথে গল্প করেছিলাম। জানতে পেরেছিলাম তাদের একদম ইনকাম নেই। মনে প্রশ্ন এসেছিল ভারতের প্রশাসন কোন কিছু ব্যবস্থা নিচ্ছে না কেন! বাড়িতে মেজ পিসিকে সারাজীবন মানুষের জন্য লড়তে দেখেছি। মনে হল এই বিষয়টার প্রতিও প্রশাসনের আকর্ষণ করা দরকার। কিন্তু তারা শুনবে কেন! তাই সবার সাথে আলোচনা করে স্থির করলাম প্রমাণ নথি যোগাড় করতে হবে। আর তার জন্য স্থির করলাম নদীর পাড় ধরে সার্ভে করতে হবে। নদীর তীরে গ্রামের পর গ্রামের মানুষ গুলোর সাথে কথা বলে জানতে হবে তাদের ইছামতির সমস্যার কথা। সেই মত ১৬ ই জুলাই ২০১৯ নদীর পাড় ধরে হাঁটা শুরু করেছিলাম। নদীর পাড় ধরে আমি সার্ভে করেছি। আর সেখানে জানতে পেরেছি তিরিশ হাজার মৎসজীবী জীবিকা হীন। আমি আপনাকে নিয়ে যেতে পারি সেই সব বাড়িতে। ভিতরে গ্রামের মধ্যে গেলে তো আরো সমস্যা হয়ত জানতে পারতাম। মাসে আয় হাজার দেড় হাজার টাকা। তার উপর নদী শুকিয়ে গেছে। খাল বন্ধ। এক একটা খালে ৫০০ থেকে ১০০০ বিঘা চাষ হয়। নদী থেকে জল তুললে মাটির নীচের জলও…. “
“একাই হাঁটা শুরু করেছিলেন, নাকী আরও কাউকে পেয়েছিলেন সাথে?”
“একা নয় সেদিন আমার মেজ জ্যাঠা আমার সাথেই পুরো হেঁটেছিল। তারপর কিছু কিছু বন্ধুবান্ধব থাকতো। আবার কখন আমি একা।”
“কিন্তু ওই গরমের সময়টা বেছে নিলে কেন?”
“এই প্রশ্নটা অনেকেই আমাকে করেছেন। আসলে ওই সময়টা না হাঁটলে তাদের অভাব অভিযোগ সমস্যার কথা এই ভাবে উঠে আসতো না। বর্ষা কালে নদীতে অল্প হলেও বর্ষার জল থাকে, ভিজে থাকে। পুজোর জন্য মানুষ ব্যস্ত থাকে। কিন্তু সমস্যার সময় গেলে সমস্যাটা তাদেরও বলতে সহজ হয়।”
“বেশ তারপর কী করে এই ১২ কিলোমিটার পরিষ্কার করার কর্মসূচি কী ভাবে হলো?”
“হাঁটে হাঁটতে এক থেকে একশ হয়ে গেলাম। একা থেকে মিছিল হয়ে গেল। সেই খবর মিডিয়াতে চলে যায়। সেখান থেকে ভারত পেট্রোলিয়াম এগিয়ে আসে। কচুরিপানা পরিষ্কার হয়। প্রায় সাড়ে চারশ মানুষ এই কর্মসূচিতে হাত লাগায়।”
“কিন্তু কচুরিপানা তো আবার হচ্ছে। আর হবেও। সেক্ষেত্রে এটার স্থায়িত্ব আনতে কী পরিকল্পনা?”
” নদীর একদম পাড়েই যাদের বাড়ি, তাদের বোঝানো হয়েছে। সেরকম ৮০ জন আছেন। তারা তাদের নিজেদের সামনের কচুরিপানা গুলো পরিষ্কার করবেন। আর সেই কচুরিপানা পচিয়ে সার তৈরি করে চাষের কাজে ব্যবহার করতে বা সার বিক্রি করবেন। তাই তারা সেটা নিজের উদ্যোগেই করবেন। আর বাকী মৎসজীবিদদের বোঝানো হচ্ছে। যে কচুরিপানা জমে গেলে তাদেরই তো ক্ষতি। তারা যেই সময় মাছ ধরতে যায়, সেই সময় কচুরিপানা কিছু পরিষ্কার করে নিতে পারে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে বেশ কিছু অসাধু লোক আছে, যারা বাধা দিচ্ছে।”
“সেক্ষেত্রে কী চিন্তা ভাবনা করছেন?”
” সেক্ষেত্রে প্রশাসনের ইনভলবমেন্ট দরকার। অনেক সমস্যা আছে। ইছামতির উপর শিয়ালদা গেদে লাইনের ট্রেন ব্রীজ আছে। আবার এই নদীটা শুধু ভারতের নয়, ভারত বাংলাদেশের। পুরো নদীটাকে সংস্কার করতে ভারত বাংলাদেশের বৈঠক হওয়া দরকার। অনেক বড় পথ…”
“তাহলে এখন কী পরিকল্পনা?”
” আপাতত ভারতের অংশটুকু পরিষ্কার করার পরিকল্পনা আছে। কঠিন অঙ্ক সমাধান করতে আমি ভালবাসি। কিন্তু একা সম্ভব নয়। যত মানুষ এই ইছামতি আন্দোলনে এগিয়ে আসবে তত এগোতে সুবিধা হবে।”

ইতিমধ্যে ২৭ শে নভেম্বর কলকাতায় পরিবেশ রক্ষায় উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য “দান উৎসব কল্যাণ” সম্মানে সম্মানিত হয়েছেন সাবর্ণ সরস্বতী। কিন্তু এখনও ওর লড়াই অনেক বাকী। ওর ইছামতি আন্দোলন সফল হোক, শুভ কামনা। আমরা যেন আবার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের তন্বী ইছামতিকে ফিরিয়ে আনতে পারি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here