গোঁড়ামি ও উদারতা।

0
166

তাতে ক্ষতিটাই বা কি ,কিসের এত গাত্রদাহ!এ কথা উত্থাপন করছি ,বড়দিন উৎসবে,রামকৃষ্ণ মিশনে যীশুখ্রীস্টের ফটো সামনে রেখে পূজার আয়োজন করার পোস্ট দেখে কয়েকজন এমন কদর্য আক্রমণ করার প্রসঙ্গে। ভারতবর্ষের সংস্কৃতির ধারক-বাহক আমাদের শ্রদ্ধার অন্যতম স্তম্ভ, রামকৃষ্ণ মিশনের প্রতি আগুন তুলে , ডোনেশন দিতে নিষেধ করে নিজেদের স্বরূপই চিনিয়েছেন এই সব অতি হিন্দুত্ববাদী ভুঁইফোড় মুখ। জোড় করে ঘৃণ্যতা ছড়ানো বরদাস্ত করে না ভারতীয় হিন্দু সংস্কৃতি।কিন্তু বিষাক্ত কিছু মানুষ, মানুষের মধ্যে ,ঐক্যের বদলে সন্দেহের বাতাবরণ তৈরি করে আপন স্বার্থে কাজ করছে,এদের থেকে সাবধান থাকা খুব জরুরি।
ধর্মের উগ্রতা নয়,সমন্বয়কারী ভূমিকার কথা এই ভারত ভূমে, বহু মহান মনীষীগণ বারে বারে উত্থাপিত করেছেন। এই ধর্মনিরপেক্ষতার পীঠস্থান ভারতবর্ষে আজ ধর্মে,ধর্মে বিরোধ লাগানো,অন্য ধর্মের প্রতি নোংরা আক্রমণ, জিগির তোলা, এক একটা ফাঁদের মতো অবস্থান করছে যা মানুষে মানুষে সম্পর্কের বুনিয়াদকে সজোরে থাপ্পড় মারে।
বড়দিনের জৌলুস ,আলোকোজ্জ্বল চার্চ,মানুষের উৎসাহ নিয়ে পথে নামা,কেবল কলকাতা কেন্দ্রিকতায় আর সীমাবদ্ধ নেই ।ছোট বড় মফস্বল শহরের মানুষজন,ব্যস্ত কৃত্রিম জীবনে উৎসব পেয়ে আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে ওঠছে ,এই চিত্র সর্বত্র বিরাজমান।এটাই তো সর্ব ধর্ম সমন্বয়ের মন্ত্র শেখানো আদর্শ ভারত ভূমি। উৎসবপ্রিয় বাঙালি মেতে ওঠে সব ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে,কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে যেকোনো প্রয়োজনে।সকল ধর্মের মানুষে পাশাপাশি বসবাস কারী কলোনিতে, যখন সব রকমের,সব ধর্মের মানুষের উৎসব হয় নিষ্ঠা ভরে, তখন মনে হয়,বাহ,এখানেই তো ভারতের ভারতীয় হয়ে ওঠার স্বার্থকতা।দুর্গাপূজা,মহরম,বড়দিন,গুরু নানক দিবস কিংবা বুদ্ধ পূর্ণিমায় যখন মুখরিত হয় আকাশ বাতাস,সবাই সব অনুষ্ঠানে মিশতে না পারে,ক্ষতি নেই ,তাবলে নিজের ধর্ম ছাড়া বাকি ধর্মের প্রতি আক্রমণ শানাবো,কটাক্ষ করবো এটা যেমন ঠিক নয়,তেমনি এটা ভারতের সংস্কৃতি সমর্থনও করে না,এ ছবি বড় অচেনা।তবু যেন ইদানিং সে চিরা চরিত নিয়মের ভালোত্ব কে ঠুনকো করে দেবার প্রয়াস শুরু হয়েছে।
দুর্গাপূজা,দীপাবলীর পর ছোট বড় অনেক পূজা পার্বণ পার করে,এসেছে বড়দিন উৎসব।বর্ষ শেষের এমন দিনে,মানবতার পূজারী যীশুকে স্মরণ করে কেক খাওয়া,ফুরফুরে পিকনিক মেজাজে মানুষের পথে নামা এ এক অনন্যতা।আমাদের মনে শুধু এটুকুই গেঁথে আছে যে বড়দিন মানে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের উৎসব ব্যাস এটুকুই। আমরা হিন্দু বলে কেবল যে ,আমাদের হিন্দুধর্মীয় অনুষ্ঠান ছাড়া অন্য ধর্মের উৎসবে যাওয়া ঠিক নয় এসব খুব একটা, সাধারণ মানুষের মনের মধ্যে আসে না ।এই পৃথকী ভাবনা বাইরে থেকে বিভেদকামী শক্তি দ্বারা মানুষের মনে ইনজেক্ট করানো হয়। এই পন্থা সমতার সমাজের পক্ষে ক্ষতিকর । যখন দেখলাম ফেসবুকে কেউ চার্চের সামনে দাঁড়ানো ছবি পোস্ট করতেই,সংকীর্ণ মানসিকতার কেউ প্রকাশ্যে বিরক্তি প্রকাশ করেছেন প্রশ্ন জাগে কিসের এত ধর্মীয় ভেদাভেদ ছড়ানোর কদর্যতা!
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পথ দেখিয়েছেন,ওনার কথায়,
‘যদি ভারতবর্ষকে জানতে চাও, বিবেকানন্দকে পড়তে হবে’, এর মধ্যেই একটা সুন্দর বার্তা নিহিত ।নানা প্রতিবন্ধকতার পাহাড় টপকে,গোরা ব্রাহ্মণ্যবাদীদের তীব্র বাধা অতিক্রম করে কায়স্থ ঘরে জন্ম নিয়েও এই বঙ্গ সন্তান, বিবেকানন্দ মহান ভারতবর্ষ প্রতিষ্ঠা করার স্বপ্ন দেখতেন,
দেখিয়েছেন।বিদেশের মাটিতে তাঁর মহান অমৃতবাণী, কুসংস্কারাচ্ছন্নতার আঁধার টপকে, স্বপ্ন দেখিয়েছিল ভারত কে বিশ্বের মানুষের কাছে গর্বের দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে। নিজের বুদ্ধিবলে মহান ভারতের আদর্শকে তিনি যেভাবে মেলে ধরেছিলেন তা আজও প্রায় প্রতিটি ভারতবাসীর হৃদয়ে উজ্জ্বল কেবল এই হিন্দুত্বের জিগির তোলা কতিপয় স্বার্থান্ধ মানুষ ছাড়া।এরা কেবল নিজেদেরকে মহান হিন্দুর তকমা সাঁটিয়ে গর্ব অনুভব করে ও বিভেদের বিষ ছড়ায়,মানুষের মনে ও সমাজে। নানা পন্থা অবলম্বনে কলুষিত করে ঘেরাটোপে বাঁচে।
সিস্টার নিবেদিতা ,মাদার টেরিজা, নিজেদের দেশ, সমাজ ,পরিবার,পরিজন ছেড়ে ছুটে এসেছেন এই ভারতভূমিতে,সেবা ধর্মের ছোঁয়ায় ভারতবর্ষকে সমৃদ্ধ করেছেন। কোন ধর্মীয় বাতাবরণে নয় মানবতাবাদের প্রতীক হয়ে বিরাজ করেছেন ভারত তথা বাঙালির মনে, সেসবের কি তবে কোনো গুরুত্ব নেই ?যে কাজী নজরুল ইসলামের ‘মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম ,হিন্দু মুসলমান’,মন্ত্র সমাজকে ধরে রাখার বার্তা ,তবে কি সব বৃথা আজ ?রামকৃষ্ণ মিশনের দিকে যেভাবে নোংরা আঙুল উঠেছে,ভণ্ডামি বলে এই সেবা প্রতিষ্ঠানের মহান ব্রত কে কলুষিত করার চক্রান্ত হলো ,তা আর যাইহোক হিন্দু ধর্মের উদারতায় দীক্ষিতদের কাজ নয়।এত স্পর্ধা হয় কি করে ,আঙুল তোলার,এদের কি নূন্যতম ধারণা আছে রামকৃষ্ণদেবের বাণীর?সারদা মায়ের ভাবধারা সম্পর্কে!
আমাদের সমাজে রামকৃষ্ণ দেবকে, মা কালীর সাধক হিসাবে বেশি প্রচার করানো হয়েছে ওনার ভাববাদ দর্শন প্রচারের থেকে ।যে মাগ দর্শন নিয়ে উচ্চমানের গবেষণা ,যে ভাবধারা সমাজ,দেশ সংহতির সহায়ক এবং যে রামকৃষ্ণ মিশন সেই আদর্শ নিয়ে আজও এগিয়ে চলেছে তার প্রতি আগুন তোলা সত্যি মারাত্মক ।ভাববাদী দর্শন এ বিশ্বকে পথ দেখানো সেরা দার্শনিক হিসেবে আমরা পাই সক্রেটিস অ্যারিস্টট্ল প্লেটো সেই সঙ্গে এই ভারতবর্ষের মহান সন্তান রবীন্দ্রনাথ বিবেকানন্দের মত মানুষের মন সমুজ্জ্বল ।
বিদ্যাসাগর,রামমোহন রায় রামকৃষ্ণদেব ,মা সারদামণি বিবেকানন্দ চৈতন্যদেব লোকনাথ ব্রহ্মচারীর,দিশা দেখানো ,ভারত, বাংলার,হিন্দু ধর্ম অনেক বেশি সহনশীল ।অন্য ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এই হিন্দু ধর্ম ,আজ যখন দেখি হিন্দুত্বের জিগিরে,মানুষকে ধর্মীয় বেড়াজালে বাধার নোংরা খেলা চলছে ,মানুষকে কেবল স্বার্থপরতার খেলায় লিপ্ত করার, এরা জানেনা হিন্দুধর্মের সহনশীলতা উদারতা কত উচ্চমানের।
এই মহান ভারতবর্ষ, কেবল গুটিকয় ভন্ড বাবার নয় ,ফুলে-ফেঁপে ওঠা কিছু দুশ্চরিত্র রাম রহিমের মত গজিয়ে ওঠা বাবাদেরও সম্পত্তি নয় । বরং এই সমস্ত কলুষিত , স্বার্থপর মানসিকতার প্রচারকদের থেকে দূরে থেকে এই ভারতবর্ষ আদতে মাদার টেরিজার ভারত।এই মহান ভারত, গৌতম বুদ্ধের ভারত ,মহাবীরের ভারত ,আবদুল কালামের ভারত,রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দের ভারত ।এই ভারত নজরুল, রবি ঠাকুরের,আম্বেদকরের নিয়েই স্বপ্ন দেখে, যা কিনা,মইনুদ্দিন চিশতিরও ভারত। এই ভারত আগামীর স্বপ্ন দেখা মানবতা বাদী জনগণেরও, সেখানে যেমন সন্ত্রাসবাদী মুসলিমদের স্থান নেই,আবার নিজেদের হিন্দু বলে দাবি করা বিভেদকামী উগ্র হিন্দুত্ববাদীরাও সেখানে ব্রাত্য।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here