চন্দ্রযান-২ এর অভিযান ৯৯ শতাংশ সফল, ল্যান্ডের বিক্রম চাঁদেই, চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে ভারত ই প্রথম: ঘোষণা ইসরোর।

0
256

দেবারতী গোস্বামীঃ- বাংলার গায়ক রাঘব চট্টোপাধ্যায় সেই গান” চাঁদ কেন আসেনা আমার ঘরে “চাঁদ ঘরে না আসলে আফসোস করার কিছু নেই, চাঁদ যেন ধরা দিয়েছে ইসরোর বিজ্ঞানীদের কাছে। বিক্রম কিন্তু চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে অবতরণ করেছে। যেখানে অবতরণ করার কথা ছিল সেখান থেকে ৫০০ মিটার দূরে। আরবিটারের তোলা শক্তিশালী থার্মাল ইমেজে ধরা পড়েছে বিক্রম এর ছবি, যদিও ল্যান্ডার বিক্রমের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন এখনো সম্ভব হয়নি। চন্দ্রযান ২ এর অভিযান ৯৯ শতাংশ সফল। চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে চ্যালেঞ্জিং অবতরণে ভারত ই প্রথম দেশ। রবিবাসরীয় দুপুরে এমনটাই ঘোষণা করেছে ইসরো।

বিক্রম অক্ষত অবস্থায় আছে নাকি, তার ক্ষতি হয়েছে কিনা? এখনো অজানা। তবে ইসরো চেয়ারম্যান কে শিবন জানিয়েছেন বিক্রমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা চলছে চাঁদের কক্ষপথ থেকে ভিডিও বার্তায় বিক্রমকে পাকড়াও করার চেষ্টা চালাচ্ছে। অরবিটার সিগন্যাল মিললেই পাঠিয়ে দেওয়া হবে পৃথিবীর গ্রাউন্ড স্টেশনে। মিশন কন্ট্রোল রুমের মনিটরে রেখে যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টাই চালাচ্ছেন মহাকাশবিজ্ঞানীরা।

প্রসঙ্গত ৭ সেপ্টেম্বর দুপুর ১টা ৫৫ মিনিটে ল্যান্ডারের সঙ্গে যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ইসরো জানায়, সফট ল্যান্ডিং-এর আগে চন্দ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ২.১ কিলোমিটার উচ্চতায় আচমকাই সিগন্যাল পাঠানো বন্ধ করে দেয় ল্যান্ডার।

কিন্তু কেন লক্ষ্যচ্যুত হলো বিক্রম লক্ষ্যের কাছে পৌঁছেও? তার সম্ভাব্য কিছু কারণ জানিয়েছিলেন মহাকাশবিজ্ঞানীরা।

গলদ হতে পারে ফাইন-ব্রেকিং পর্যায়ে
ইসরো জানিয়েছে, অরবিটার থেকে আলাদা হওয়ার পরে একটু একটু করে চাঁদের দিকে এগিয়ে গেছে বিক্রম। চন্দ্রপৃষ্ঠ থেকে শেষ ১০০ কিলোমিটারের দূরত্ব পেরিয়ে অবতরণের জন্য মোট চারটি পর্যায় ছিল, রাফ ব্রেকিং, ফাইন ব্রেকিং, হোভারিং ও প্যারাবোলিক ডিসেন্ট। রাফ ব্রেকিং উতরে গিয়েছিল বিক্রম। সমস্যা হয়েছিল ফাইন ব্রেকিং-এর সময়।

বিজ্ঞানীদের ধারণা, চাঁদের ৩০ কিলোমিটার উপর থেকে নামা শুরু করার সময় বিক্রমের গতি ছিল ১,৬৮০ মিটার প্রতি সেকেন্ড। পরবর্তী ১০ মিনিটে সেটা ক্রমশ কমে দাঁড়ায় ১৪৬ মিটার/সেকেন্ড। এর পর শুরু হয় ফাইন-ব্রেকিং স্টেজ। চাঁদের থেকে মাত্র ৫ কিলোমিটার দূরত্বে গতির উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে বিক্রম। শেষ ২.১ কিলোমিটারে তাই আর কোনও যোগাযোগই করা যায়নি তার সঙ্গে। ঘড়ির কাঁটায় তখন ১টা ৫৫ মিনিট তখনই বিক্রম এর সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।

গবেষকদের মতে, পৃথিবীর আয়োনোস্ফিয়ার যেমন মহাজাগতিক রশ্মিকে প্রতিফলিত করতে পারে। চাঁদে তেমনটা হয়না। সরাসরি আছড়ে পড়ে চাঁদের বুকে। আর চাঁদের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ণ ধুলিকণায় সেই রশ্মির ঝাপটা লেগে উত্তাপ অনেকটাই বাড়ে। ল্যান্ডিং-এর সময় বিক্রম গতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে এই ধূলিকণা যন্ত্রের ভিতরে ঢুকে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তা ছাড়া ধূলিকণার ঘর্ষণে উৎপন্ন তাপও রেডিও যোগাযোগ ছিন্ন করে দিতে পারে।

৭ সেপ্টেম্বর থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দিনটিকে চন্দ্রপৃষ্ঠে গবেষণার জন্য বেছে নেওয়ার সম্ভাব্য কারণ-

চাঁদে যে ১৪ দিন কাজ করার কথা ছিল রোভার প্রজ্ঞানের, সেই ১৪ দিন চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে সূর্যের আলো পড়ার কথা। হিমশীতল, অন্ধকার দক্ষিণ মেরু অভিযানের জন্য তাই ৭ সেপ্টেম্বর থেকে ২১ সেপ্টেম্বর মধ্যেকার সময়টাকেই বেছে নিয়েছিল ইসরো। কারণ, বিক্রম ও প্রজ্ঞান চলবে সৌরবিদ্যুৎশক্তিতে, তাই গবেষণা, অনুসন্ধান, পরীক্ষানিরীক্ষার জন্য চাঁদের ওই অংশে সূর্যের আলোকে পুরোপুরি ব্যবহার করতে পারবে ল্যান্ডার ও রোভার।

কলকাতার ইন্ডিয়ান সেন্টার ফর স্পেস ফিজিক্সের ডিরেক্টর, বিশিষ্ট জ্যোতির্বিজ্ঞানী সন্দীপ চক্রবর্তী জানান বিক্রম এর সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার সম্ভাব্য কারণগুলি হতে পারে-

“চাঁদের দক্ষিণ মেরুর ঠিক যে জায়গায় নামার কথা ছিল, সেখানে ল্যান্ড করেনি বিক্রম। তাহলে ইসরো এতক্ষণে বিক্রমের খোঁজ পেয়ে যেত। সুতরাং, বোঝাই যাচ্ছে নির্দিষ্ট জায়গার পাশে অন্য কোথাও অবতরণ করেছে বিক্রম তাই সেখানকার রেডিও সিগন্যাল এখনও ইসরোর হাতে আসেনি।”

সন্দীপ বাবু আরও জানান, থার্মাল ইমেজে রেগোলিথ বা চাঁদের ধূলিকণার যে তাপমাত্রা ধরা পড়েছে, সেটা ওই নির্দিষ্ট জায়গার তাপমাত্রা নয়, যেখানে ল্যান্ডিং-এর জন্য বিক্রমকে প্রোগাম করা হয়েছিল। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, অরবিটার কিছু ধাতব অংশের খোঁজ পেয়েছে যার হাবভাব বিক্রমের মতো এবং তাপমাত্রা আশপাশের ধূলিকণা বা রেগোলিথের থেকে আলাদা। ইসরো তাই বলতে পারছে বিক্রমের খোঁজ মিলেছে। কিন্তু, আশঙ্কা একটা থেকেই যাচ্ছে। বিক্রম যদি ১২ ডিগ্রির বেশি ঢাল নিয়ে চাঁদের বুকে নামে, তাহলে তার দরজা খুলে রোভার প্রজ্ঞান বার হতে পারবে না। সে ক্ষেত্রে, আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। সূর্যের আলো দক্ষিণ মেরুর ওই অংশে পড়লে, সৌরশক্তিতে বিক্রমের ট্রান্সমিটার অ্যাকটিভ হবে এবং যদি সে অক্ষত থাকে তাহলে ফের কাজ করা শুরু করবে।

ইসরোর পরবর্তী পরিকল্পনা চন্দ্র অভিযান নিয়ে আসুন এক নজরে একটু দেখে নেওয়া যাক –

২০২০ সালের শেষের দিকে আরেকটি চন্দ্র অভিযানের পরিকল্পনা রয়েছে ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরো। যেটি হল চন্দ্রযান ৩ মিশন। সেক্ষেত্রে জাপানের সাথে যৌথভাবে চন্দ্রযান ৩ মিশনে অংশগ্রহণ করার কথা চিন্তাভাবনা করছে ইসরো।সেই বিষয়ে কাজও খুবই জোরকদমে চলছে এমনটাই জানানো হয়েছে তরফ থেকে ইসরোর তরফ থেকে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here