প্রখ্যাত বাউল সাধক অনন্ত দাস বাউল-এর একান্ত সাক্ষাৎকার।

0
1777

বাংলা সঙ্গীত জগতে বাউল গান এক আলাদা মাত্রা বয়ে চলেছে। বহু বাউল সাধক এই বাউল গানকে আজও লালন পালন করে চলেছেন। বাউল গান মাটির গান। জীবনের গান। জীবন থেকে উঠেআসা কথা ও সুর। আজ আমরা এমন একজনের মুখোমুখি হয়েছি যাঁর সুরেলা কন্ঠের জাদুতে মুগ্ধ আপামর সঙ্গীত প্রিয় মানুষ। তাঁর মধু মাখা সঙ্গীত জয় করেছে মানুষের হৃদয়। তিনি আর কেউ নন, প্রাখ্যাত বাউল সাধক অনন্ত দাস বাউল। আমরা আজ এসে হাজির হয়েছি অনন্ত দাসের বাড়িতে, যেটা নিমতলা আশ্রম নামে অধিক পরিচিত। আমরা যেমন তাঁর কন্ঠ সঙ্গীত শুনব, পাশাপাশি তার মুখে শুনব তাঁর সঙ্গীত জীবনের অন্তহীন পথ চলার কথা। সব খবর নিউজ পোর্টালের পক্ষ থেকে আমি সমীর ঘোষ ও ক্যামেরায় সন্দীপ দে আজ অনন্ত দাস বাউলের মুখোমুখি।
প্রঃ- তুমি কত বছর বয়স থেকে সংগীত চর্চা শুরু করলে?
উঃ-২০-২১ বছর বয়সে। তাছাড়া এর আগে আমি যাত্রা, নাচের অপেরা করেছি। মৃৎশিল্পী হিসেবেও কাজ করেছি। দুর্গা প্রতিমা গড়েছি।
প্রঃ- তুমি প্রথম কার কাছে গান শিখেছো?
উঃ- নিমাই দাস বৈরাগী। উনি আসতেন নদীকূলে। সেখানে সনাতন গোঁসাই এর বাড়ি। ওনার এক মানুষ করা ছেলেকে গান শেখাতে। তখন আমার মনে হলো বাউল শিখতে হবে।ছেলেটির এক মাসী ছিলেন। মাসি তখন আমায় বলে ঘুটে কুড়োনির ব্যাটা গান শিখবে? সেই জেদ থেকে আমার বাউল গান শেখা।
প্রঃ- যিনি ঘুটে কুড়ানীর ব্যাটা বলেছিলেন, তিনি এখন তোমাকে কিভাবে?
উঃ- আমার মনে হয় কথাটি না বললে বোধহয় আমার বাউল গান শেখা হত না। আমি এক পশ্চিমের মহোৎসবে গান করতে গিয়েছিলাম। সেখানে অনেক বড় বড় বাউল শিল্পী ছিলেন। আমি মাকে নিয়ে গিয়েছিলাম সেখানে। সেখানে ছিলেন নিমাই দাস বৈরাগ্য।তখন আমার গান দেখে, আমার মায়ের পায়ে ধরে বলেছিল, আমার ঘুটে কুড়োনির ব্যাটা কথাটি বলা ভুল হয়েছিলো। আজকে তোমার ছেলে কত বড় হয়ে গেল। আমার ব্যাটার কিছুই হলো না।
প্রঃ- এখন প্রায় প্রত্যেক বাড়িতে একটা গানের রেওয়াজ শুরু হয়েছে। তুমি যখন বাড়ির থেকে বাইরে গানের সাধনা করতে, তখন তোমার বাড়ি থেকে কোন বাঁধা আসেনি?
উঃ- না,আমি নিমাই দাস, নরহরি দাস বৈরাগীর কাছে এবং মুর্শিদাবাদের যতীন দাস এর কাছে আমি গান শিখেছি। এবং শেষে দীনবন্ধু দাস অর্থাৎ গোষ্ঠ গোপাল দাসের বাবার কাছে আমি শিক্ষা নিয়েছি।
উঃ- গোষ্ঠ গোপালের বাবা হলেন তোমার গুরুদেব। তুমি হলে আবার গোষ্ঠ গোপালের গুরুদেব। সেটি তোমার কেমন লাগে?
উঃ-ভাবতে ভালো লাগে। গোষ্ঠ গোপাল আমার বাড়িতে আসতো, থাকতো এবং ভিক্ষাও করতো। আমরা দুজনে একসঙ্গে মধুকরিও করেছি। এখন গোষ্ঠ গোপাল পশ্চিমবাংলায় এক জনপ্রিয় শিল্পী। আমাকে দীনবন্ধু বাবু বলেছিলেন অনন্ত তুমি এখানে রয়ে যাও।
প্রঃ- তুমি বর্তমানে স্টেজ শো করছো। তুমি কবে থেকে এসব শুরু করলে?
উঃ- আমার প্রথম স্টেজ কামারপুকুরে। আমি তখন আরামবাগের বাজারে একতারা নিয়ে গান গাইতাম। কানাই বাবু আমার গান শুনে আমাকে ওনাদের অনুষ্ঠানে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেই অনুষ্ঠানে ডাক্তার রাধাকৃষ্ণ পাল ,হুগলীর ডিএম এবং এডিএম ছিলেন। ওই অনুষ্ঠানে এডিএমের মেয়েও একটি গান করেছিলে।
প্রঃ- তুমি কলকাতায় গিয়েছিলে কিভাবে?
উঃ-সালটা বোধহয় ১৯৭৭ হবে। পশ্চিমের এক মহোৎসবে গান করতে গিয়েছিলাম।সেখানে দীনবন্ধু দাস ছিলেন। তিনি গান শুনে বলেন তোমার এত সুন্দর গলা। তুমি এখনো এখানে পড়ে আছে অনন্ত? আমার সঙ্গে কলকাতা চলো। ওখান থেকে সোজা কলকাতা গেলাম।
প্রঃ- তুমি আকাশবাণীতে গান করতে শুরু করলে ১৯৭৭ এ সেটা কিভাবে সম্ভব হলো?
উঃ- আকাশবানীতে আমাকে সহায়তা করেছিলেন হরেন মুখার্জী। তিনি শ্যামল মিত্রর সাথে যোগাযোগ করে দিয়েছিলেন। যেদিন অডিশন ছিল শ্যামলবাবু ডাইরেক্টরকে বলেছিলেন, এটা আমার ক্যান্ডিডেট একটু দেখবেন।
তুমি আকাশবাণীতে কোন গানটি করেছিলে?
উঃ- এ দেহ দিয়ে মাটি পরিপাটি…….
প্রঃ-কলকাতায় তুমি আস্তে আস্তে জায়গা করতে শুরু করেছিলে, তাহলে কলকাতা থেকে চলে এলে কেন?
উঃ-একটু হেসে হ্যাঁ, আমি কলকাতায় জায়গা করতে শুরু করেছিলাম। বহু বিখ্যাত গীতিকার, সুরকারের সান্নিধ্যে এসেছিলাম। কিন্তু মায়ের টানে, গ্রামের মানুষের প্রতি ভালবাসা, এবং মাটির টানে আমি আমার গ্রামে ফিরে এলাম।
প্রঃ-মাকে নিয়ে তুমি কোন গান গেয়েছো? যদি একটু শোনাও।
উঃ-মাগো তোমায় দেখি যেন আমার গানের জলসায়………
প্রঃ-একটা সময় তুমি দিনবদলের গান গাইতে। সত্যিই কি দিন বদলেছে বলে তোমার মনে হয়?
উঃ-একটু হেসে হ্যাঁ, বদলেছে। আরো বদলাবে আশা রাখি।
প্রঃ-এখন অানাচে,কানাচে যেসব বাউল দেখা যায়, তারা কি প্রকৃত বাউল?
উঃ- একটু হেসে বললেন না সকলেই বাউল নয়। তবে কিছু কিছু বাউল। বাউল হতে গেলে বাউল এর চারটি ভাগ আগে জানতে হয়।
প্রঃ-বাউলরা অনাড়াম্বর জীবনযাপনে অভ্যস্ত। কিন্তু বর্তমান দিনে বাউলদের জীবন যাপন কেমন যেন বদলে গেছে। তুমি কি এর জন্য দিন বদলের গান গাইতে?
প্রঃ- না। সকল বাউলের জীবন যাপন বদলে যায় নি। যারা সাধক বাউল তাদের জীবন যাপন একই আছে। কিন্তু বেশ কিছু বাউল তাদের জীবন যাপন বদলে ফেলেছে। তার কারণেই সাধক বাউলরা আস্তে আস্তে পিছিয়ে পড়ছে।
প্রঃ-বর্তমান সরকার লোক প্রসার শিল্পের জন্য ভাতা দিচ্ছে। এতে কি লোক শিল্পের প্রসার ঘটছে বলে মনে করো?
উঃ-প্রসার ঘটেছে অনেকে। যাটা কোনোদিন এই গানের জগতে ছিলনা, তারা নাম লিখিয়ে। ভাতা পাচ্ছে।এবং তার এখন গানও শিখছে, গানও গাইছে। যদি বর্তমান সময়ে সরকার যেমন অডিশন নিয়ে, সেই শিল্পীদের ভাতা দিচ্ছে। যদি অনেক আগে থেকেই করা যেতো তাহলে আমার মনে হয় একটু ভালো হতো।
প্রঃ-তোমার কাছে বহু প্রথিতযশা শিল্পীরা আসেন, যাদের বিভিন্ন মিডিয়াতে দেখা যায়। কে কে এসেছেন তোমার কাছে?
উঃ-স্বপন, সাধন বৈরাগ্য, অশোক, মোনা খ্যাপা এবং আরো অনেকে। এছাড়াও বাংলাদেশ থেকেও শিল্পী আসে যে দু’দিনব্যাপী আমি বাউল মহোৎসব করায় সেখানে বহু শিল্পীর সমাবেশ হয়।
প্রঃ-জাপান থেকে শিল্পীরা বাংলায় এসে বাউল গান গাইছে। এটা কেমন অনুভূতি?
উঃ-খুব ভালো। বাউল তো এখন বাইরেই বেশি চলছে।
প্রঃ-বাউলের সাথে লোক সংগীতের পার্থক্য কোথায়?
উঃ-বাউল অন্তরের গান। যা বাংলার মা, মাটিকে নিয়ে গাওয়া হয়। আর লোক সঙ্গীত হলো কিছু রেকর্ডিং গান।যার মধ্যে নিজস্বতা নেয়।
প্রঃ-বাউলের সাথে ভাটিয়ালীর তফাৎ কোথায়?
উঃ-তফাৎ শুধু সুরের। ভাটিয়ালি বাংলাদেশের অর্থাৎ মূলত নদীকেন্দ্রিক গান। যেমন মাঝির গান, ভাওয়াইয়া।
প্রঃ-তোমার বয়স কত?
উঃ-ভোটার কার্ডে যা বয়স আছে তাতে কম। তবে আমার বয়স ৮৬ বছর।
প্রঃ-এ বয়সে এতো এনার্জি পাও কোথা থেকে?
উঃ-সবই ওপরওয়ালার জোটানো।
প্রঃ-তোমরা বাউলরা উপরওয়ালার সাধনা করো। আমরা যারা নিচে আছি তাদের নিয়ে কি বলবে?
উঃ- উৎসাহ দেবো। বলব যা করছো তা ভালো করে মন দিয়ে করো।
প্রঃ-সব বাউল কী জীবনের কথা বলে?
উঃ-না। সবাই না। তবে কিছু কিছু বাউল জীবনের কথা বলে।
প্রঃ-এতদিন সঙ্গীত সাধনা করে কি পেয়েছো?
উঃ-নাম। মানুষের ভালোবাসা। যেটা একটা শিল্পীর কাছে সবচেয়ে বড় পাওয়া।
প্রঃ-তোমরা অর্থাৎ বাউলরা জন্মান্তরে বিশ্বাসী। তুমি পরজনমে কী হতে চাও?
উঃ-এটা গানে গানে বলবো। আর জনমে আবার যেন আমি বাউল হইয়া……..
 অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই আপনাকে ‘সব খবর’ এর পক্ষ থেকে আমাদের সময় দেওয়ার জন্য। আগামি দিন গুলোতেও আপনার সুরের ঝর্ণায় মোহিত হয়ে থাক আপামর সঙ্গীত প্রিয় মানুষ। আমাদের সকলের শুভেচ্ছা, ভালোবাসা ও বিনস্র শ্রদ্ধা জানাই। ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন এই কামনা করি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here