“বঙ্গবন্ধু এমন একজন শ্রেষ্ঠ নেতা যিনি প্রথম ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান রাষ্ট্র “বাংলাদেশ” গড়েছেন দক্ষিণ এশিয়র অঞ্চলে।” : কামনা দেব।

0
648

১৭ই মার্চ ২০২০ বাংলা একটা ভাষার নামে রাষ্ট্রের জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীর প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও সংগ্রামকে গভীরভাবে উপলব্ধি করা জরুরি। কারণ বঙ্গবন্ধু বাঙালিদের জন্য অসাম্প্রদায়িক গনতান্ত্রিক সমতাভিত্তিক রাষ্ট্র চেয়েছেন। সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সংগ্রামকে ধর্মনিরপক্ষেতা দিকে নিয়ে যেতে ধাপে ধাপে এগিয়ে গেছেন রাষ্ট্রের মূল নীতির ধারণায়। স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান চারটি মূল নীতির হিসেবে সন্নিবিষ্ট করেছিলেন ১৯৭২ সালে।

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যার পর সামরিক শাসক জিয়া ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশের সংবিধান থেকে ধর্মনিরপক্ষেতার মূল নীতি সহ ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী বিধিগুলি ছেঁটে ফেলে দেন।
বঙ্গবন্ধুর সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী নীতি গ্রহণ করা কারো কারো কাছে অবাক করেছিল তখন। কারণ , বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের শুরু বঙ্গীয় মুসলিম লীগের ছাত্র সংগঠন দিয়ে, যা পরবর্তীতে মুসলিম লীগের কর্মী হিসেবে। সেদিক দিয়ে বঙ্গবন্ধু ছিলেন দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে প্রস্তাবিত পাকিস্তানি আন্দোলনের একনিষ্ঠ কর্মী। শৈশব কৈশোরে নিজ গ্রাম শহরে সাম্প্রদায়িক আবহে বেড়ে উঠলেও হিন্দু মুসলিম সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভাবাবেগতাড়িত করতে পারে নাই বঙ্গবন্ধুকে ।
পাকিস্তান সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু প্রচারে বলেছিলেন, “পাকিস্তান এর দাবী হিন্দুদের বিরুদ্ধে নয়, বরং হিন্দু মুসলমানদের মিলনের জন্য। যাতে হিন্দু মুসলিম দুই ভাই শান্তিপূর্ণভাবে এখানে বসবাস করতে পারে এর জন্য।”
১৯৪৬ সালে ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’তে “গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং ” এর জন্য তৎকালীন কংগ্রেস নেতা ও পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসবিদরা বঙ্গবন্ধুর নেতা শহিদ সোহরাওয়ার্দীকে অভিযুক্ত করলে বঙ্গবন্ধু তাঁর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। এমনকি হিন্দু এলাকায় মুসলিমদের ও মুসলিম এলাকায় হিন্দুদের জীবন বিপন্ন করে বিশাল সাহসের সাথে এগিয়ে দেন উভয় সম্প্রদায়ের জীবন রক্ষার জন্য।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পাকিস্তানের প্রতি মোহভঙ্গ ঘটে। ১৯৪৮ এর ১১ই মার্চ ভাষার দাবিতে বঙ্গবন্ধু গ্রেপ্তার হন। আর তখন থেকেই আর এক নতুন মুজিবুরের জন্ম হয়। ২১ দফা দাবির ভিত্তিতে ভাষা আন্দোলন শুরু করেন। পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসন সহ যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন ইত্যাদি নিয়ে স্বাধিকার সংগ্রামের মাধ্যমে বাঙালি জাতির জন্য ভাষার নামে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা করেন।
পাকিস্তানের রাজনৈতিক দলের মুখ্য বিষয় ও উদ্দেশ্যই ছিল সাম্প্রদায়িকতার বিরোধ করা। যে কারণে জেলে থেকেই মজলুম জন নেতা মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে আওয়ামী মুসলিম দল গঠন হয় এবং শেখ মুজিবুর রহমান যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হন।
এসব বিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লিপিবদ্ধ করে গেছেন। সেই লিপিবদ্ধ কথাগুলো হলো,–
–“আমি মনে করেছিলাম,পাকিস্তান হয়ে গেছে তাই সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের দরকার নেই। একটা অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হবে, যারা বাইরে আছেন,তারা চিন্তা ভাবনা করেই আছেন।
যুক্তফ্রন্টের বিজয়ের পর তিনি আওয়ামী মুসলিম লিগকে আওয়ামী লীগ দলে পরিবর্তন করেন। এক্ষেত্রেও সভাপতি হিসেবে মওলানা ভাসানী রূপান্তরের পথিকৃৎ ছিলেন।
১৯৬৪ সালে হিন্দু মুসলিম দাঙ্গার সময় সমস্ত পূর্ব পাকিস্তান যখন রুখে দাঁড়িয়েছিল তখন দাঙ্গা বিরোধী কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই নেতৃত্বে ছিলেন।
১৯৭১ সালে যখন পূর্ব বাংলার মানুষ পাকিস্তানের অবসান ঘটাতে বদ্ধপরিকর তখন পাকিস্তানের মহলে কোন প্রকার সাম্প্রদায়িক প্ররোচনা,সংঘাত না ঘটে তারজন্য ৭ই মার্চ ঐতিহাসিক ভাষণ দেন।
সেই ভাষনে তিনি হুঁশিয়ারি দিতে ভুলেন নি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন,—- “শুনুন, মনে রাখুন, শত্রুবাহিনী ঢুকেছে, ওরা আমাদের মধ্যে আত্মকলহ সৃষ্টি করে লুটতরাজ করবে। এই বাঙলায় হিন্দু মুসলিম,বাঙালি বিহারী যারাই আছেন তাঁরা আমাদের ভাই , তাঁদের রক্ষার দায়িত্বও আমার আপনার উপর। আমরা যেন কোন ভাবেই বদনাম না হই। ”
পাকিস্তান আন্দোলন থেকে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আন্দোলন পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধ দ্বারা পরিচালিত হয়েছিলেন এবং উনার এই আদর্শকে সর্ব্বোচ্চে স্থান দিয়ে গেছেন।
পাকিস্তান আমলে ধর্মের নামে মানুষের মধ্যে বিভেদ ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সৃষ্টি,গণহত্যা,লুণ্ঠন, ধর্ষণ,অগ্নিসংযোগ ইত্যাদি ঘটনাবলির পরিপ্রেক্ষিতে বাঙালিরা শাশ্বত আদর্শে অসাম্প্রদায়িক সমাজ সংস্কৃতি ঐতিহ্যে বাংলাদেশকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়।
এইজন্য বঙ্গবন্ধুকে মিথ্যা প্রচার,দল ও দলের বাইরে প্রবল বিরোধিতার সম্মুখীন হতে হয়েছে। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমানকে তাঁর অবিচল চিন্তাধারা ও লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি।
বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবার দশ মাসের মধ্যেই বঙ্গবন্ধু তাঁর স্বপ্নের প্রিয় দেশকে ১৯৭২ সালে দক্ষিণ এশিয়ার অঞ্চলের মধ্যে প্রথম ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান উপহার দেন।

কামনা দেব(সংগ্রহিত তথ্যনির্ভর), ভারতবর্ষ ত্রিপুরা আগরতলা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here