বাংলাদেশের বিখ্যাত মঞ্চাভিনেতা সালাউদ্দিন লাভলু’র একান্ত সাক্ষাৎকার নিলে আর এক প্রতিভাবান উদীয়মান অভিনেতা আখন্দ জাহিদ।

0
798

সালাউদ্দিন লাভলু। শোবিজ অঙ্গনের এক প্রিয় নাম। মঞ্চ, টেলিভিশন এবং চলচ্চিত্রে অভিনয়ের পাশাপাশি নির্মাণেও রয়েছে তার সমান সফলতা। মঞ্চ দিয়ে সংস্কৃতি লালন করা এ মানুষটি চার দশকেরও বেশি সময় ধরে সফলতাকে সঙ্গী করে একাগ্রচিত্তে কাজ করে যাচ্ছেন শোবিজ অঙ্গনে। নিজের সমসাময়িক বিভিন্ন কাজ ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন যুগান্তরের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন- আখন্দ জাহিদ।

আরও অনেক পেশা থাকতে শিল্পচর্চাকে পেশা হিসেবে বেছে নেয়ার কারণ কী?
শিল্পচর্চার সঙ্গে নিজেকে জড়িত করব এমন কোনো ভাবনাই আমার কখনও ছিল না। এইচএসসি পাস করার পর আমি যখন ঢাকায় আসি তখন আমার গুরু মামুনুর রশিদের সঙ্গে পরিচয় হয়। শিল্পের প্রতি তার একাগ্রতা আমাকে মোহিত করেছে বেশ। একজন মানুষ জন্মগ্রহণের পর সমাজের প্রতি, দেশের প্রতি, অন্য মানুষের প্রতি এমনকি এই পৃথিবীর প্রতি কী দায়িত্ব হওয়া উচিত এসব যাবতীয় কথা তার মুখ থেকে শোনার পর সিদ্ধান্ত নিই এ কাজটিই আমি করব। তবে কোনো শিল্পী কিংবা পেশা হিসেবে নয়। একজন মানুষ হিসেবে মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ থেকে। তারপর থেকেই যুক্ত হই নাটকের সঙ্গে। তবে নাটকের সঙ্গে যুক্ত না হলেও শিল্পের প্রতি ভালোবাসা ভালোলাগার কারণে আমি তখন শিল্পের যে কোনো মাধ্যমেই নিজেকে যুক্ত করতাম। ভবিষ্যতে কী হবে না হবে এমন চিন্তা কখনই করিনি। নিজের থাকা-খাওয়ার ব্যাপারে কখনই কোনো চিন্তা করিনি। আমার মনে হয় গ্রুপ থিয়েটারের আমিই একমাত্র নাট্যকর্মী ছিলাম, যার ভরণ-পোষণের জন্য দল থেকে প্রতিমাসে সম্মানী প্রদান করা হতো।

শিল্পী না হলে আপনি কী হতেন?

আমরা পাঁচ ভাই এক বোন। আমার বাবা কখনই সন্তানদের ইচ্ছা, ভালোলাগার বিষয় নিয়ে কোনো ধরনের চাপ প্রয়োগ করতেন না। বাবা-মা দু’জনই ছিলেন শিল্পানুরাগী। নবম শ্রেণিতে থাকাকালীন তারা আমাকে সঙ্গীতের স্কুলে ভর্তি করে দেন। সঙ্গীতের প্রতি মন না থাকায় দু’বছর ক্লাস করেও আমি কিছুই শিখতে পারিনি। পরবর্তীতে ঢাকায় এসে নাটকের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর আমার বাবা-মা আমার ইচ্ছার বিরোধিতা করেননি। তবে শিল্পী না হলে কী হতাম তা আমি কখনই ভাবিনি। কারণ যখনই জীবন নিয়ে ভাবনা চিন্তার সময় ছিল তার আগে থেকেই আমি শিল্পের ছায়াতলে চলে এসেছি। এবং শিল্পচর্চাকে আঁকড়ে ধরে ভবিষ্যৎ পথচলার স্বপ্ন দেখেছি। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শিল্পের মধ্য থেকেই নিজের সততা দিয়ে সচেতনভাবে শিল্পের কাজ করে গেছি। পরবর্তীতে এই শিল্পচর্চাই আমার পেশায় পরিণত হয়েছে।
মঞ্চ দিয়েই আপনার হাতেখড়ি। তাহলে এখন মঞ্চ থেকে দূরে কেন?
মঞ্চের কারণেই আজকের আমি। মঞ্চের প্রতি আমার প্রবল ভালোলাগা-ভালোবাসা থাকলেও আমাদের দেশে মঞ্চে কাজ করে জীবন অতিবাহিত করার কোনো সুযোগ যেমন আগেও ছিল না, এখনও তৈরি হয়নি। সত্যি কথা বলতে অন্য কোনো পেশার সঙ্গে জড়িত হতে পারিনি বলেই জীবন বাস্তবতার সঙ্গে সমন্বয় করে চলতে গিয়েই মঞ্চ থেকে দূরে চলে আসতে হয়েছে।
মঞ্চে ফেরার ইচ্ছা আছে?
আমার এখনও মঞ্চে ফেরার জন্য মন কাঁদে। মাসুম রেজার ‘সুরগাও’ নাটকে আমার অভিনয়ের কথা থাকলেও সময়ের কারণে করে উঠতে পারিনি। পরবর্তীতে কিছুদিন আগে মাসুম রেজার আরেকটা মঞ্চ নাটক ‘পেন্ডুলাম’-এ আমার অভিনয় করার কথা। যথারীতি একদিন মহড়া কক্ষে গিয়েও মহড়া করা হয়ে ওঠেনি। পরবর্তীতে আমরা যারা একসঙ্গে কাজ করার কথা সবাই একসঙ্গে হয়ে আর কাজটা করা হয়ে ওঠেনি। মঞ্চের মধ্যে একটা উন্মাদনা আছে। আমি যে কোনো সময়ই মঞ্চে ফেরার জন্য প্রস্তুত।

মঞ্চ, টেলিভিশন এবং চলচ্চিত্র। এই তিন মাধ্যমের অভিনয়কে আপনি কীভাবে দেখেন?
তিন মাধ্যমে অভিনয়ে আমি কোনো পার্থক্য দেখি না। অভিনয় কিংবা চরিত্রায়ণের ভাবনা, সূত্র, পদ্ধতি, ব্যাখ্যা এবং শিকড় যা-ই বলি না কেন সবকিছু একই। মূল পার্থক্যটা হচ্ছে কারিগরি জায়গায়। যেমন মঞ্চে উচ্চস্বরে অভিনয়ের পাশাপাশি শারীরিক অভিনয়টাও অনেক বেশি করতে হয়। টেলিভিশন বা চলচ্চিত্রে এসে সেই অভিনয়টাই কারিগরি চাহিদার ওপর নির্ভর করে পরিমিতভাবে করতে হয়। মঞ্চে অভিনয়ের ক্ষেত্রে একজন শিল্পী পুরোপুরি স্বাধীন হলেও টেলিভিশন কিংবা চলচ্চিত্রে সেটা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
নাটক কিংবা সিনেমা নির্মাণের ক্ষেত্রে আপনি গ্রামীণ পটভূমির গল্পের প্রতিই দুর্বল। এর কারণ কী?
কারণ তো অবশ্যই আছে। আমি যখন আরণ্যক নাট্যদলের হয়ে নাট্যচর্চা শুরু করি তখন আমাদের বোধের জায়গাটা এমন হয়েছে যে, শিল্প হবে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের কথা বলা। আর সেই সাধারণ মানুষের বেশিরভাগেরই অবস্থান হচ্ছে গ্রামে। গ্রামই হচ্ছে আমার কাছে বাংলাদেশ। মানুষের হাসি, কান্না, আনন্দ-বেদনা, আবেগ-অনুভূতিগুলো বোঝার জন্য গ্রামের বিকল্প নেই। গ্রাম হচ্ছে আমাদের শিকড়। আমার নির্মাণ গ্রামীণকেন্দ্রিক হওয়ার এটা প্রধান কারণ। আমি যখনই শহরমুখী হলাম তখন আমি আমার গ্রাম, গ্রামের মানুষ, গ্রামীণ প্রকৃতির অভাব অনুভব করতে শুরু করলাম। গ্রামের মানুষের সরলতা, আবেগ, অনুভূতি প্রকৃতির সরল প্রবহমানতার বহমান চিত্র আমায় দারুণভাবে আকৃষ্ট করে। আমি যদি নাটক নির্মাণ না করে শিল্পচর্চায় অন্য কোনো মাধ্যমেও জড়িত থাকতাম তাহলেও আমি গ্রামকেই বেছে নিতাম। কারণ গ্রাম হচ্ছে আমার কাছে আমার আবেগ, অনুভূতি এবং আমার বেড়ে ওঠার শিকড়। তাই শিকড় বাদ দিয়ে আমার মাঝে অন্য কোনো চিন্তা কাজ করে না।
অভিনয় নাকি পরিচালনা কোনটাতে নিজেকে খুঁজে পান?
অবশ্যই পরিচালনা। পরিচালনা আমি অনেক বেশি উপভোগ করি। পরিচালনার মাধ্যমে আমার ভাবনার প্রতিটা মুহূর্ত প্রতিটি ফ্রেম আমি আমার মতো করে দেখাতে পারি। এই সৃষ্টি আনন্দ কিংবা ভালোলাগা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।
নিজের পরিচালনায় অভিনয় করতে কেমন লাগে?
এখন আর আমি নিজের পরিচালনায় অভিনয় করি না। একসময় করতাম যখন বয়স কম ছিল। এখন যদি ভাবি আমার মনে হয় তখন আমার এটা করা উচিত হয়নি। কারণ দুটি কাজ একসঙ্গে দুটিতেই সমস্যা হয়। আমি মনে করি একজন অভিনেতা পরিচালক দ্বারা নিয়ন্ত্রিণ হতে হবে। অন্যের পরিচালনায় অভিনয় করতে গেলে কোনো ঝামেলা হয় না। কিন্তু যখন নিজেই নিজের পরিচালক তখন অভিনয়ের ক্ষেত্রে একটু ঝামেলায়ই পড়তে হয়।
পরিচালনায় আসার আগে চিত্রগ্রাহক হিসেবে কাজ করেছেন। নির্মাতা হওয়ার পেছনে চিত্রগ্রাহকের কোনো ভূমিকা ছিল?
আমার টেলিভিশন নাটক পরিচালনার আগেই মঞ্চ নাটক পরিচালনার একটা অভিজ্ঞতা ছিল। যেহেতু টেলিভিশন নাটক পরিচালনায় কারিগরি দিকটাই অনেক বেশি, সে ক্ষেত্রে চিত্রগ্রহণের কাজটা আমাকে টেলিভিশন নাটক পরিচালনার ক্ষেত্রে অনেকাংশেই সাহায্য করেছে। আমি নিজেও একটা সময় এডিট করতাম। সেই এডিটসহ ক্যামেরার নানা শট থেকে শুরু করে যাবতীয় কারিগরি দিক আমার পরিচালনাকে আরও অনেক সমৃদ্ধ করেছে। পাশাপাশি চিত্রগ্রহণের বিভিন্ন কারিগরি দিক অভিনেতা হিসেবেও আমাকে সাহায্য করেছে।
বর্তমানে অনেক নাটকই পরিচালক থাকা সত্ত্বেও চিত্রগ্রাহকের নির্দেশনায় হয়ে থাকে। একজন পরিচালকের এই অপারগতাকে আপনি কীভাবে দেখেন?
নাটক হচ্ছে অনেক শিল্পের সমন্বয়। একজন পরিচালক হতে হলে তাকে শিল্পের সব মাধ্যমগুলো সম্পর্কে জানতে হবে। পাশাপাশি একটি দৃশ্যের ভাবমূর্তি বজায় রেখে কীভাবে দৃশ্য ধারণ করতে হবে সে বিষয়েও পরিচালককে জানতে হয়। এখন যারা পরিচালানার কাজ করছে তাদের মধ্যে অনেক প্রতিভা রয়েছে। কিন্তু সেটাকে পরিপূর্ণভাবে ব্যবহার করতে হবে। আধো আধো জ্ঞান নিয়ে হয়তো কাজ করা যায়, কিন্তু বেশিদূর যাওয়া সম্ভব নয়। তাই আমার মনে হয় লিডারশিপে নামার আগে একজন পরিচালককে অবশ্যই শিল্পের সবকটা বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করা অতীব জরুরি।
ব্যবসায় সফল চলচ্চিত্র ‘মোল্লা বাড়ির বউ’ নির্মাণের পরও চলচ্চিত্র নির্মাণ নিয়মিত করেননি কেন?
এটার মূল কারণ হচ্ছে অর্থ প্রাপ্তির পদ্ধতিগত ব্যবস্থা। একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে আমাদের দেশে একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা যে পরিমাণ শ্রম, মেধা আর পরিশ্রম বিনিয়োগ করে থাকেন সে তুলনায় অর্থনৈতিক প্রাপ্তির বিষয়টি একেবারেই নগণ্য। যা নিয়ে নিজেই চলতে কষ্ট হয়ে যায়। পরিবার তো দূরের কথা। আরেকটা কারণ হচ্ছে আমাদের চলচ্চিত্রে বর্তমান অবস্থা। কারণ এমতাবস্থায় একজন প্রডিউসারের টাকা ফেরত পাইয়ে দেয়া খুবই দুষ্কর। তাই সব কিছু মিলিয়ে ব্যবসা সফল ছবি ‘মোল্লা বাড়ির বউ’ নির্মাণের পরও আমি আর ছবি নির্মাণে আগ্রহ প্রকাশ করিনি।
বর্তমান ব্যস্ততা কী নিয়ে?
আমার যত ব্যস্ততা সবকিছুই আমার কাজকে ঘিরেই। আমার পরিচালনায় সপ্তাহের প্রতি শনিবার ও রোববার রাত ৮টায় চ্যানেল আইতে ‘প্রিয় দিন প্রিয় রাত’ নামে একটি ধারাবাহিক নাটক প্রচার হচ্ছে। আমি একসঙ্গে একাধিক ধারাবাহিক নাটক নির্মাণ করি না বিধায় এই ধারাবাহিকটি নিয়েই আমার যাবতীয় ব্যস্ততা। পাশাপাশি অভিনয় নিয়েও ব্যস্ততা চলছে।
ভবিষ্যৎ কাজের পরিকল্পনা কী নিয়ে?
আমি পরিকল্পনা নিয়ে কোনো কাজ করি না। বর্তমান সময়টাকে খুবই গুরুত্ব দিই। আমি বিশ্বাস করি বর্তমানটা সুন্দর হলে অতীত এবং ভবিষ্যৎ এমনিতেই সুন্দর হবে। ভবিষ্যতে কিংবা দুই বছর পাঁচ বছর পর কী করব না করব এই ভেবে বর্তমানের সুন্দর মুহূর্তটাকে নষ্ট করতে রাজি নই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here