সুন্দরবনের ব্যাঘ্রবিধবা দুর্গাদের নিয়ে বিজয়া সম্মিলনী।

0
392

সুভাষ চন্দ্র দাশ, গোসাবাঃ—দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলার প্রত্যন্ত সুন্দরবনে গোসাবা ব্লকের বালি গ্রাম পঞ্চায়েতের মথুরাখন্ড গ্রামে মঙ্গলবার বিজয়া দশমীর সন্ধ্যায় এক অনন্য ভাবে ব্যাঘ্রবিধবা মা ও তাঁদের শিশু সন্তাদের নিয়ে বিজয়া সম্মিলনী পালিত হল।এমন বিজয়া সম্মিলনী অনুষ্ঠান যা সুন্দরবনের বুকে এক অনন্য বিরল ইতিহাসও বটে।
এলাকার প্রায় শতাধিক বিধবা মা ও তাঁদের সন্তানরা উপস্থিত ছিলেন এই অনুষ্ঠানে। উল্লেখ্য অনবরত নিজের আবহে বয়ে চলেছে সুন্দরবনের বিদ্যাধরী নদী। একদিকে সুন্দরবনের বনের গহীন জঙ্গল পীরখালি,যেখানে সর্বক্ষণ সুন্দরবনের রয়্যাল বেঙ্গলের বিচরণ ক্ষেত্র এবং আনাগোনা। ঠিক তার বিপরীত দিকে গ্রাম মথুরাখন্ড।জীবন জীবীকার তাগিদে পরিবারের সকলে মুখে অন্নতুলে দেওয়ার সন্ধানে প্রতিনিয়ত এই গ্রামের পুরুষরা সুন্দরবনের গহীণ অরণে পাড়ী দিতেন মাছ,কাঁকড়া,কাঠ এবং মধু সংগ্রহের জন্য।
অনেকে হাসি মুখে ফিরতেন অনেকেই আবার বাঘের আক্রমণে পড়ে চিরতরে হারিয়ে গেছেন। পরিবারে একমাত্র উপার্জন কারীর এমন করুণ পরিনতিতে অসহায় হয়ে পড়ে তার পরিবার।এই মথুরাখন্ড গ্রামে এমন পরিবারের সংখ্যা রয়েছে প্রায় শতাধিক।
শারদীয়ার আনন্দে সকলে যখন আনন্দঘন মুহূর্তে মেতে ওঠেন,বাঙালীর বৃহত্তম উৎসব শারদীয়ার তাৎপর্য্য কি সেই অনুভুতি নেই এই সমস্ত অসহায় দরিদ্র পরিবার গুলির কাছে।তারপর বিজয়ার কোন গুরুত্ব নেই অর্ধাহারে অনাহারে দিন কাটানো পরিবার গুলির কাছে।
যদিও প্রত্যন্ত সুন্দরবনের জঙ্গলের উপর নি নির্ভর করে বেঁচে থাকা গোসাবা,বালি,আমলামেথি,মথুরাখন্ড,সত্যনারায়ণপুর,কুমীরমারী,ঝড়খালি,লাহিড়ীপুর,সাতজেলিয়ার মানুষ প্রতিনিয়ত জীবন সংগ্রাম লড়াই চালিয়ে কিভাবে বেঁচে রয়েছে তা নিজের চোখে উপলব্ধি করেছেন বিশিষ্ট সমাজসেবী তথা বাসন্তী হাইস্কুলের শিক্ষক অমল নায়েক।আর সেই কারণে তাদের দুঃখ দুর্দশার করুণ মর্ম বেদনায় অংশীদার হয়ে বাঘ কিংবা কুমীরের হাতে আক্রান্ত হয়ে নিহত পরিবারগুলির পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। এযাবৎ প্রায় ৩০০ মহিলা কে বিভিন্ন কর্মসংস্থানের মধ্যদিয়ে স্বনির্ভর করার প্রায়াস চালিয়ে যাচ্ছেন অমল বাবু। পাশাপাশি প্রায় শতাধিক শিশুর পড়াশোনার দায়িত্ব নিয়ে কর্মযঞ্জ চালিয়ে যাচ্ছে শিক্ষক অমল নায়েক।এমন বিশাল দায়িত্বপূর্ণ কর্মযঞ্জের দীর্ঘ প্রসার করতে কলকাতার বেশকিছু বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে ২০১৪ সালে গঠন করেন “সেভ্ টাইগার অ্যাফেক্টেড ফ্যামিলি(ষ্টাফ)”।চলতি বছর শারদীয়ার আগমনের আগেই সমগ্র জেলার বিভিন্ন প্রান্তের এই সমস্ত দুঃস্থ পরিবার গুলির হাতে নতুন বস্ত্র তুলে দিয়েছিলেন। পুজো ভালো কাটলেও অসহায় দরিদ্র ব্যাঘ্রবিধবা পরিবার গুলির কথা মনে পড়তে দশমীর সকালে হৃদয়টা ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ে অমল বাবুর।তিনি তাঁর অপর আর এক সঙ্গী বিশিষ্ট সমাজসেবী ও শিক্ষক প্রভুদান হালদার কে সাথে নিয়ে রওনাদেন সুন্দরবনের প্রত্যন্ত দ্বীপ মথুরাখন্ড গ্রামে।সেখানে প্রায় শতাধিক ব্যাঘ্রবিধবা মা ও তাঁদের সন্তানদের মুখে মিষ্টি তুলে দিয়ে পালন করনে বিজয়া সম্মিলনী। পাশাপাশি ছোট ছোট স্কুল ছাত্রছাত্রীদের হাতে তুলে দেন পড়াশোনার একাধিক সরঞ্জাম।
সুন্দরবনের বুকে এই সর্বপ্রথম ব্যাঘ্রবিধবা মায়েদের নিয়ে বিজয়া সম্মিলনী তে উপস্থিত ছিলেন দীর্ঘ ষাট বছর আগে বাঘের আক্রমণে স্বামী কে হারানো ১০২ বছরের প্রবীণা খ্যান্তমণি ঢালি। তার মুখে পুত্রস্নেহে বিজয়ার মিষ্টি তুলেদেন অমল বাবু।
ব্যাঘ্রবিধবা মা ও শিশু ললিতা মন্ডল,দুর্গামণি দাস,বন্যা রাধিকারা জীবনে প্রথম বিজয়া সম্মিলনীর স্বাদ পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে ওঠে।
বিশিষ্ট শিক্ষক তথা সমাজসেবী প্রভুদান হালদার বলেন “অমল বাবু ডাকে সাড়া দিয়ে এমন দুর্গা মায়েদের বিজয়া সম্মিলনীর অনুষ্ঠানে এসে নিজে কে ধন্য মনে হয়েছে।”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here